ব্রহ্মপুত্র নদ

ব্রহ্মপুত্র নদ (Brahmaputra river) বাংলার ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি নদ। হাজারো ইতিহাসের সাক্ষী এই নদ। আজ আমরা এই নদ সম্পর্কে জানবো। কীভাবে এখানে যেতে হয় এবং কীভাবে ভ্রমণ করব তা বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

ব্রহ্মপুত্র নামকরণ

বঙ্গভূমির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটগ নদ ব্রহ্মপুত্র। সংস্কৃত পুরাণে ব্রহ্মপুত্রের অর্থ “ব্রহ্মার পুত্র”। তাই এটাকে “ব্রহ্মপুত্র নদ” বলা হয়। আগে ব্রহ্মপুত্রের নাম ছিল লৌহিত্য।

ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি

ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের কাছে জিমা ইয়ংজং হিমবাহে। যেটা তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। ‘জাংপো’ নাম নিয়ে তিব্বতের পূর্বদিকে বয়ে গেছে। এরপর এটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে। তখন এটা  শিয়াং নাম ধারণ করে। এরপর আসামের উপর দিয়ে দিহাং নাম ধারণ করে বয়ে যায়। এই সময় এতে দিবং এবং লোহিত্য নামক আরো দুটি বড় নদী যুক্ত হয়। এরপর এটা সমতলে এসে প্রশস্ত হয় এবং এর নাম ব্রহ্মপুত্র হয়ে যায়। এই নদীটি তিব্বত, অরুনাচল, আসাম হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চলে গেছে। অতঃপর সেটা জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরববাজারের দক্ষিণে মেঘনায় গিয়ে পতিত হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র কীভাবে যমুনা হলো

১৭৮৭ সালে আসামে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের হয়। সেই ভূমিকম্প ব্রহ্মপুত্র নদ এর তলদেশ‌ উৎপন্ন হ‌ওয়ার কারণে এর দিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৭৮৭ সালের আগে ব্রহ্মপুত্র ময়মনসিংহের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে বয়ে যেত‌। কিন্তু ভূমিকম্পের কারণে পরবর্তীতে এর নতুন শাখা নদীর সৃষ্টি হয়, যা এখন যমুনা নামে পরিচিত।

নদের দৈর্ঘ্য

ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৮৫০ কিলোমিটার। বাহাদুরাবাদে ব্রহ্মপুত্র নদ সর্বোচ্চ প্রস্থ, প্রায় ১০৪২৬ মিটার। এটাই বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ব্রহ্মপুত্রের  প্রধান শাখা যমুনা।

ব্রহ্মপুত্র কেন নদ- এটা নদী নয় কেন

আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, কোনো জলধারাকে কেন নদ বা নদী হিসেবে আলাদা করা হয়। অনেক মুরুব্বীরা বলে থাকে যে এই জলধারার কোনো শাখা হয় না তাকে নদ বলে। কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে ভিন্ন। আমরা বাস্তবে দেখতে পাই ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখা রয়েছে যাকে যমুনা নামে ডাকা হয়। তাহলে তো এটা আগে নদী বলা উচিত ছিল। তবুও এটা নদ কেন?

এর কারণ কোনো জলধারা নাম যদি মহিলাবাচক হয় তাহলে সেটা নদী এবং পুরুষবাচক হলে নদ। গঙ্গা, যমুনা, পদ্মা, গৌরী, ভাগীরথী, চিত্রা,, সরস্বতী, নর্মদা, কাবেরী, কৃষ্ণা কর্ণফুলী ইত্যাদি মহিলাবাচক নাম, তাই এগুলো নদী।
অপরদিকে কপোতাক্ষ, ব্রহ্মপুত্র, মুসা খান, মির্জা মাহমুদ, নারদ, ভৈরব, কুমার প্রভৃতি পুরুষবাচক নাম, তাই এইগুলো নদ।

শহিদুল হকের মতে, মূলত যে জলধারার নামের শেষে আ-কার বা ই-কার থাকে তাকে নদী বলে। আর যেই জলস্রোতের নামের শেষে আ-কার কিংবা ই-কার থাকে না তাকে নদ বলে। যেমন-তুরাগ, ব্রহ্মপুত্র কপোতাক্ষ, নীল (মিশর) ইত্যাদি নদ।
তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে।
যেমন : ‘আড়িয়ালখাঁ’ পুরুষজ্ঞাপক নাম হলেও শেষে আকার আছে। তাই এটি নদ না হয়ে হয়েছে নদী। কিন্তু ‘মুসা খান’ নামের অন্ত-বর্ণ ‘দন্ত্য-ন’-এর পরে আকার-একার কিছুই নেই, তাই এটি নদ। ‘সিন্ধু’ বানানের শেষে হ্রস্ব উ-কার আছে, সেই কারণে এটি নদ।

ব্রহ্মপুত্র নদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

আগেই বলেছি ব্রহ্মপুত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ। আগে দূরদূরান্তে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথ ছিল একমাত্র ভরসা। কেননা আগে আধুনিক যানবাহন ছিল না। তাই নৌ পথ দিয়েই দূর-দূরান্তে সফর করতে হতো। ভুটান, আসাম, অরুনাচল, তিব্বত এ সকল অঞ্চলের কোনো সমুদ্র তীর নেই। তাই এরা বঙ্গভূমিকে ব্যবহার করত পণ্য আমদানি রপ্তানি করতে। এমনকি তিব্বত হয়ে চীনেও পণ্য আমদানি রপ্তানি হতো। এসব অঞ্চলগুলোতে একমাত্র ব্রহ্মপুত্র ছাড়া আর কোনো বড় নদী নেই। তাই এটা দিয়েই শত শত বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন নৌ যোগাযোগ ছিল।

১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আসাম রাজ পূর্ববঙ্গে আক্রমণ করে। সে সময় এই ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবহার করেই ঢাকায় আগমন করেছিল। কখন নদের তীরস্থ শত শত গ্রাম ও নগরে ব্যাপক অত্যাচার ও লুণ্ঠন করে।

এরপর ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে কুচবিহারের রাজা ব্রহ্মপুত্রে রণতরী ভাসিয়ে এই নদের তীরবর্তী গ্রামগুলোতে আবারো ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর ঢাকায় আক্রমণ করে এবং ঢাকা নগরী দখল করে।

ব্রহ্মপুত্র ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

এটা যে একটি ঐতিহাসিক নদ সেই সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। সেই সাথে এটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত স্রোতস্বিনী। সেই হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের বরফ গলা জল এতে বয়ে চলছে। হাজার হাজার গ্রাম সে জলে বিধৌত হয়ে চলছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। ব্রহ্মপুত্রের পানিতে চাষ হচ্ছে সুজলা সুফলা বাংলার ধান্যক্ষেত্র। এই নদীর পানিতে পবিত্র হয়ে মানুষজন উপাসনা করছে। কেউ বা এই নদীর তীরে চিতায় প্রজ্জ্বল্লিত হয়ে মুক্তি লাভ করছে। অগণিত মানুষের স্মৃতি এই ব্রহ্মপুত্র নদ।

শরৎকালে এর দুই পাশ কাশফুলে ছেয়ে যায়। কত সুন্দর সেই দৃশ্য। রবি ঠাকুরের ছোট নদী কবিতার সেই চিক চিক বালি এখানে দেখতে পাওয়া যায়। শীতকালে এর পানি অনেকটা শুকিয়ে যায়। তখন চাইলে আপনি হেঁটেও এই নদী পার হতে পারবেন।
কিন্তু বর্ষাকালে ভরা যৌবনে উপনীত হয়। তখন এর স্রোতকে আটকাবে কার সাধ্য।

বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এই নদীতে মাছ ধরে। বহু মানুষের জীবন সংগ্রাম এই নদীকে ঘিরে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় নগর সভ্যতার আগ্রাসনে এই নদটিও কুলুষিত হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র ভ্রমণ কীভাবে করবেন?

ঢাকা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে অনেক গাড়ি ময়মনসিংহ আসে। এরমধ্যে সবচেয়ে ভালো সার্ভিস দেয় এনা। এর ভাড়া ৩২০ টাকা।
এছাড়া আপনি চাইলে ট্রেনেও ভ্রমণ করতে পারবেন। ট্রেন ভাড়া ৮০-১২০ টাকা।

থাকার স্থান

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ বেশি দূরে নয়। দিন গিয়ে দিন চলে আসা যায়। তবুও আপনি যদি সেখানে একটি দিন থাকতে চান তাহলে রয়েছে অনেক মানসম্মত হোটেল। এগুলোর মধ্যে হোটেল আমির ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল মুস্তাফিজ ইন্টারন্যাশলনাল, হোটেল হেরা, হোটেল সিলভার ক্যাসেল, হোটেল খাঁন ইন্টারন্যাশনাল খুবই জনপ্রিয়। এগুলোতে স্বল্প ভাড়ায় আপনারা থাকতে পারবেন।

খাবার

ময়মনসিংহ শহরে অসংখ্য ভালো ভালো রেস্তোরাঁ রয়েছে। যেগুলোর নাম বলে শেষ করা যাবে না। কেননা এটা একটি বড় শহর। তবে আজকাল ধানসিঁড়ি নামক একটি রেস্টুরেন্টের কথা খুব আলোচনা হচ্ছে। চাইলে সেখানে গিয়ে খাবার খেতে পারেন।

আরও পড়ুন: সোমেশ্বরী নদী – দূর্গাপুর

নৌকা ভ্রমণ

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে দেখবেন অনেক ছোট ছোট ডিঙি নৌকা আছে। এগুলো দিয়ে জেলেরা মাছ ধরে। আপনি চাইলে তাদের সাথে দরদাম করে নৌ ভ্রমণ করতে পারেন।

যখন আপনি নৌকা দিয়ে নদে ভ্রমণ করবেন, তখন আপনার মনে হতে পারে এই জল পথেই হাজারো মানুষ শত শত বছর ধরে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। কেউ বা বধূ সেজে গেছে শ্বশুরবাড়ি। কেউ গেছে দূর দেশে বাণিজ্য করতে। কত রাজা-বাদশা গেছে রাজ্য দখল করতে। সবাই কি তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছে? কারো কারো ভাগ্যে ঘটেছে সলিল সমাধি।
ইতিহাসের সাক্ষী এই নদ। এটাকে সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের। পানি দূষণ থেকে এই নদীকে বাঁচাতে হলে আমাদেরকে এই সচেতন হতে হবে।

ময়মনসিংহের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান

  • রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি,
  • বিপিন পার্ক,
  • আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ী,
  • বোটানিক্যাল গার্ডেন,
  • ময়মনসিংহ,
  • শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা,
  • ময়না দ্বীপ,
  • আলেকজান্ডার ক্যাসেল,
  • মেঘমাটি ভিলেজ রিসোর্ট,
  • শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্ক,
  • বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,
  • সন্তোষপুর রাবার বাগান।
  • শশী লজ,
  • মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি।

তথ্যসূত্রঃ

শ্রী কেদারনাথ মজুমদার প্রণীত ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ।
• বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল-আব্দুল করিম।
• এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা।

FAQ’S

ব্রহ্মপুত্র নদ কোথায় অবস্থিত?

হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের নিকটে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে তিব্বত ও আসামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

ব্রহ্মপুত্র নদের দৈর্ঘ্য কত?

উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৮৫০ কিলোমিটার।

ব্রহ্মপুত্র নদী কোন জেলায় অবস্থিত?

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের গাইবান্ধা, শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার একটি বিশাল নদ।

ব্রহ্মপুত্র নদীর প্রধান উপনদীর নাম কী কী?

ডানদিকে – কামেং নদী,  রায়ডাক নদী, জলঢাকা নদী,  তিস্তা নদী । বাঁদিকে – দিবাং নদী, ধানসিঁড়ি নদী, লোহিত নদী ।

ব্রহ্মপুত্র কোথায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে?

ভারতের আসামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।