ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে

ডেঙ্গু একটি ভাইরাস জনিত জটিল রোগ। প্রতিবছরই বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এমনকি বছরের কিছু সময়ে শত শত মানুষকে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকতে হয়। ডেঙ্গুকে হাড়-ভাঙা জ্বরও বলা হয়। প্রচন্ড কষ্টদায়ক এই জ্বর অন্যান্য সাধারণ জ্বর থেকে দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম হয়ে যায়। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে, সে সম্পর্কে জেনে নিন।

ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে

ডেঙ্গুর জীবাণু সংক্রমণ হয়ে লক্ষণ ও উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে ১-২ সপ্তাহের মধ্যেই ডেঙ্গু সেরে যায়। রোগীদের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের মধ্যেই ডেঙ্গুজ্বর পুরোপুরি ভাবে প্রতিকার হয়। কিন্তু কিছু রোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে বিশেষ কোন লক্ষণ দেখা যায় না। এই রোগের লক্ষণ সমূহের সূত্রপাত থেকে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময় ৩-১৪ দিন স্থায়ী হতে পারে। কখনো বা ৪-৭ দিন।

অনেক সময় ডেঙ্গু রোগটি শুধুমাত্র সাধারণ জ্বরের মতো লক্ষণ নিয়েও সেরে যেতে পারে। এমনকি ৮০% মানুষের ক্ষেত্রেই সাধারণ জ্বরের লক্ষণ দেখিয়েই সেরে যায়। প্রথমবার জ্বর হলে লক্ষণ বোঝা যায় না বলে, একে ব্রেকবোন ফিভারও বলা হয়। অন্যদিকে শুধুমাত্র ৫% মানুষ এই রোগের প্রাণঘাতী পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগের স্থায়িত্ব সুনির্দিষ্ট নয়।

ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর কত সময় পর জ্বর হয়

সাধারণত এডিস মশা কামড়ানোর ৫-৭ দিনের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে জ্বর হয়। আর সেই জ্বর আরো ৫-৬ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে।

ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু বহনকারী মশার নাম এডিস এজিপ্টি বা বাংলাদেশে প্রধানত ডেঙ্গু মশা নামেই পরিচিত। এই এডিস এজিপ্টি মশা যখন কোন ডেঙ্গুর রোগী থেকে রক্ত শোষণ করতে যায়, তখন এটি সংক্রমিত হয়ে পড়ে। এছাড়া অন্যান্য কারনেও এটি সংক্রমণি হতে পারে। যখন সেই সংক্রমিত মশার কাউকে কামড় দেয় তখন তার ডেঙ্গু রোগ হয়। 

ডেঙ্গু রোগের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ জ্বর হওয়া। তবে এডিস এজিপ্টি মশা কামড়ানোর সাথে সাথেই ডেঙ্গু রোগ হয়না। বরং ডেঙ্গু সংক্রমিত মশা কামড়ালে ৪-১০ দিনের মধ্যেই ডেঙ্গুর বিভিন্ন লক্ষণ শরীরে প্রকাশ পেতে থাকে। এ সম্পর্কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক বলেন, “ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হবার পর থেকে লক্ষ্মণ দেখা দিতে ৫-৭ দিন সময় লাগে।” ডেঙ্গু রোগের এই সময় কালকে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড।

আক্রান্ত রোগীর শরীরে ডেঙ্গুর জীবাণু কতদিন সক্রিয় থাকে?

চিকিৎসক ও ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, “ডেঙ্গু ভাইরাসের চার ধরনের সেরোটাইপ পাওয়া যায়। এগুলোকে ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪ নামে চিহ্নিত করা হয়।” একেকটি সেরোটাইপের একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১ বার সংক্রমিত হয়। অর্থাৎ স্পষ্টভাবে বলা যায়, একজন মানুষ তার সারা জীবনের সর্বোচ্চ ৪ বার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারে, ভিন্ন ভিন্ন সেরোটাইপে।

যখন কোন ব্যক্তি একবার এক ধরনের সেরোটাইপের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, তখন তার শরীরে বিশ্বাস এন্টিবডি তৈরি হয়। সেই এন্টিবডি সারা জীবনের জন্য সে ধরনের ডেঙ্গু থেকে প্রতিরোধ করে। তারপর পুনরায় ডেঙ্গুর ভিন্ন ধরনের সেরোটাইপে আক্রান্ত হতে পারে। 

সাধারণত যতদিন রক্তে ডেঙ্গুর ভাইরাস থাকবে, ততদিন রোগীর শরীরে জ্বর থাকবে। রক্ত জীবাণুমুক্ত হলেই ডেঙ্গু জ্বর সেরে যায়। তাই জ্বর সেরে গেলে বুঝবেন ডেঙ্গুর জীবাণু আর সক্রিয় নেই।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ

<yoastmark class=

ডেঙ্গু অন্যান্য সাধারণ রোগের মতোই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মশা কামড় দিলে ৪-৭ দিনের মধ্যেই তার লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। এবং তীব্র জ্বর হয়ে প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গু সেরে যায়। তবে সংক্রমিতদের মধ্যে প্রায় ২০ ভাগ মানুষের শরীরে ডেঙ্গু জ্বর তীব্র হয়। প্রাথমিক পর্যায় থেকে গুরুতর পর্যায়ে পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের যে সকল লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় সেগুলো হলো:

  • তীব্র জ্বর হওয়া ও ঠান্ডা লাগা।
  • সমগ্র শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হওয়া। বিশেষ করে জয়েন্টে ব্যথা, পেশিতে ব্যথা, মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া।
  • শরীরে লালচে র‍্যাশ বা লাল রঙের ফুসকুড়ি পড়া।
  • তীব্র পেট ব্যথা হওয়া ও পেট ফাঁপা।
  • মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
  • পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।
  • মেরুদণ্ড ও কোমরে ব্যথা হয়।
  • অনিয়ন্ত্রিত বা বারবার মলত্যাগ করা।
  • কাশি।
  • ক্ষুধামন্দা।
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ক্লান্তি।
  • রক্তচাপ কমে যাওয়া, পালস রেট বেড়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাবে এবং মলের সাথে রক্তপাত হওয়া।
  • দাঁতের মাড়ি ও নাক থেকে রক্তপাত হওয়া। কিছু কিছু আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প রক্তপাতও হতে পারে।
  • শ্বাস-প্রশ্বাসের স্থায়িত্ব কমে যাওয়া ও দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া।
  • অস্থিরতা অনুভব করা ও বিরক্তিভাব আশা।

উপরোক্ত লক্ষণ ও উপসর্গগুলো সকল ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে একই হবে, এমনটি নয়। মূলত ডেঙ্গু রোগের স্থায়িত্ব এবং কোন রোগের শরীরে কতটা প্রভাব ফেলেছে তার উপর নির্ভর করে।

ডেঙ্গু টেস্ট রিপোর্ট পেতে কত সময় লাগে

ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা করা হয়। একেক ধরনের টেস্টের রিপোর্ট পেতে এক একেক রকম সময় লাগে। সাধারণত সকালে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য রক্ত নিলে বিকেলের মধ্যেই রোগীকে রিপোর্ট সরবরাহ করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের টেস্টের ক্ষেত্রে মাত্র ৪৫ মিনিটের মতো সময় লাগে। অর্থাৎ সর্বমোট ১ ঘন্টার মধ্যেই টেস্টের রিপোর্ট প্রদান করা সম্ভব।

কিন্তু সামগ্রিক বিষয়টি নির্ভর করে আপনি যে হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু টেস্ট করাচ্ছেন, সেই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যার উপর। হাসপাতালে যদি ইতিমধ্যেই গুরুতর অবস্থার ডেঙ্গু রোগী থেকে থাকে, তাহলে তাদের রিপোর্টটিই আগে প্রদান করা হবে। এছাড়াও সরকারি হাসপাতাল গুলোতে অতিরিক্ত রোগীদের সমাগম থাকায় ২৪ ঘন্টার পূর্বে ডেঙ্গু টেস্ট রিপোর্ট আমার সম্ভব হয় না।

ডেঙ্গু রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি যেই টেস্টগুলো করাতে পারেন সেগুলো হলো:

(১) অ্যান্টিবডি পরীক্ষা

এই আণবিক পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তের নমুনায় ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে জেনেটিক উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়।

(২) PCR টেস্ট

পিসিআর বলতে পলিমারেজ চেইন প্রতিক্রিয়ার পরীক্ষা করাকে বোঝানো হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গুর পাশাপাশি মশাবাহিত অন্যান্য রোগ, যেমন- চিকুনগুনিয়া, জিকা ইত্যাদিও সনাক্ত করা সম্ভব।

এছাড়াও ডেঙ্গু রোগের তীব্রতা দেখা দিলে রক্তের হিমোগ্লোবিন টেস্ট সহ আরো বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।

ডেঙ্গু জ্বর হলে সুস্থ হতে কত দিন লাগে?

ডেঙ্গু জ্বর হলে সুস্থ হতে ১০-১৫ বা কারো বেশি সময় রাখতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যেই দেহ সুস্থ হয়ে যায়। এদিক থেকে ডেঙ্গু রোগের অবস্থাকে ৩ পর্যায়ে ভাগ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ৪-১০ দিনের মধ্যেই রোগীর দেহে প্রায় ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত অত্যধিক জ্বর হয়। এ সময় বিভিন্ন শারীরিক অবক্ষয়, শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়।

৫০-৮০% রোগীর ক্ষেত্রেই এই প্রাথমিক পর্যায়ে ডেঙ্গু সুস্থ হয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্বল্প পরিমান রোগীর দেহে ডেঙ্গু চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং গুরুতর লক্ষণ প্রকাশ পায়। তখন ১-২ দিন পর্যন্ত প্রবল জ্বর। এই সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকলতাও দেখা দিতে পারে। এসময়, যাদের দেহে এর আগেই ডেঙ্গু ভাইরাসের অন্যান্য সেরোটাইপের সংক্রমণ ঘটেছে তারা অধিক ঝুকির সম্মুখীন হয়। 

আরও পড়ুন: যৌনস্বাস্থ্যে উপকারী খাবার

যাদের ডেঙ্গু রোগ চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছায় তাদের দেহে ভিন্নরকম র‍্যাশ হয়, হৃদস্পন্দনের গতি কমে যায়, রক্তে প্লাটিলাটির মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এই অবস্থায় রোগীর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। রোগী মূর্ছা যায় এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসময় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই ৩ টি পর্যায় পার হলে ডেঙ্গু রোগে আরোগ্য লাভ করে।