সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা – সিলেটর অন্যতম দর্শনীয় স্থান

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা: সবুজের বুকে অপূর্ব সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেট শহরের মায়াবী ঝরনা/সংগ্রামপুঞ্জি জলপ্রপাত। ছোট বড় পাথরের বুক চিরে নেমে আসে স্বচ্ছ পানির স্রোত এটি। সংগ্রামপুঞ্জি জলপ্রপাত এর তিন পাশেই রয়েছে সবুজ গাছপালা, পিচ্ছিল পাথর আর বালুময় প্রান্তর। এগুলোর মাজখান দিয়ে বয়ে চলছে স্বচ্ছ পানির স্রোত।

বর্ষাকালে সিলেট যেন তার রূপের বিচিত্র পসরা সাজিয়ে ভ্রমণপিপাসু সকলকে আমন্ত্রণ করে বাংলার অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য। এই মায়বী ঝর্ণার মায়ায় পড়ে অবিরাম তার দিকে ছুটছেন দেশ-বিদেশের ভ্রমণ পিপাসুরা।

সংগ্রাম পুঞ্জি ঝর্ণার অবস্থান

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত। এই ঝর্ণাটি সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হেটে যাওয়ার দূরত্ব অতিক্রম করলেই এর দেখা মিলে।

সাধারণত এটি ভারতের ভূখণ্ডে পড়েছে। তবে সেখানে বিএসএফের প্রহরায় বাংলাদেশিরাও ভ্রমণ করতে পারে। ঝর্ণাটি সংগ্রামপুঞ্জিতে অবস্থিত বলে এটি সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এই ঝর্ণার আরো কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন- মায়াবী ঝর্ণা, উৎমাছড়া, সেন গ্রাম পুঞ্জি ঝর্ণা।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণার সৌন্দর্য

সংগ্রামপুঞ্জির নদী, পাহাড় ও ঝর্ণা মিলে একটি আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই ঝর্ণার উৎস হলো ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে থাকা ডাউকির উঁচু পাহাড়শ্রেণী। সেখান থেকে নেমে আসে এই ঝর্ণার স্রোতধারা। সংগ্রামপুঞ্জির আকর্ষণের মূল কারণ হলো এই ঝর্ণার পানির স্বচ্ছতা। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারনে এই ঝর্ণাটি প্রাণ ফিরে পায়। এই সময়ে সেখানকার চারপাশ পানিতে কানায় কানায় টুই টুম্বুর থাকে।

বর্ষাকালে এই স্থানটি এক অন্যরকম মায়াবী হয়ে উঠে। পাহাড়, নদীর স্বচ্ছ পানি, মেঘ ও বৃষ্টি মিলে পরিবেশটাকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। এই মায়াবী দৃশ্যর কারণে অনেকের কাছে এই ঝর্ণাটি মায়াবী ঝর্ণা নামেও পরিচিত।

কয়েক ধাপ বিশিষ্ট এরকম ঝর্ণা বাংলাদেশে ও দেশের বাইরে খুব কম দেখা যায়। ঝর্ণা থেকে দূরে অবস্থান করেই পাহাড় দিয়ে পানি বেয়ে নেমে আসার শব্দ শোনা যায়। সেখান থেকে সামনে যেতেই গাছ, পানি ও পাথরের এক অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এই স্বচ্ছ পানির স্রোতটি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে কয়েকটি ধাপে। কখনো পিচ্ছিল পাথরের বুক চিরে আবার কখনো সবুজ ঝোপ ঝাড়ের ভিতর দিয়ে।

ঝর্নার নিচে একটি ছোট্ট পুকুরের আকার ধারণ করেছে। পুকুরটির তিন দিকেই রয়েছে পাথরের বড় বড় চাই। সেখানের ঠান্ডা পানিতে নেমেও আনন্দ উপভোগ করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কয়েক ধাপ বিশিষ্ট ঝর্ণাটির শেষ ধাপে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গটি রহস্যময় সুড়ঙ্গ নামেও পরিচিত। সুড়ঙ্গের মুখের প্রথমের কিছুটা অংশ দেখা যায় আর বাকিটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সুড়ঙ্গের ভিতরে ঠাই পাওয়া যায় না বলে ঐ পথে কেউ যায়না। আজ পর্যন্ত এই সুড়ঙ্গের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে এই ঝর্ণার সৌন্দর্য বলে প্রকাশ করা যায় না। সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে নিজে প্রকৃতির সাথে মিশে দৃষ্টি তৃপ্ত করতে পারলেই সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণার সঠিক স্বাদ পাওয়া যায়।

সিলেট থেকে কিভাবে সংগ্রামপুঞ্জিতে যাবেন? 

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা
সংগ্রামপুঞ্জি

সড়কপথে সিলেট সদর থেকে জাফলং-এর দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার। জাফলং জিরো পয়েন্টে অবস্থিত পিয়াইন নদী বোটে/নৌকায় ভাড়া করে যেতে হয় সংগ্রামপুঞ্জিতে। বর্ষাকালে জলপ্রপাতের সামনে পর্যন্ত নৌকা যাতায়াত করলেও শুকনা মৌসুমে নৌকা থেকে নেমে ১০/১৫ মিনিট পাঁয়ে হাটলেই সংগ্রামপুঞ্জি জলপ্রপাত পৌছাতে পারবেন।

রির্জাভ গাড়িতে সংগ্রাম পুঞ্জি ভ্রমণ করতে যেতে পারবেন বন্দরবাজার শিশু পার্কের সামনে থেকে সিএনজি, লেগুনা কিংবা মাইক্রোবাসে। সিলেটের প্রায় সব জায়গা থেকেই রিজার্ভ গাড়ি পেয়ে যাবেন সংগ্রাম পুঞ্জি যাওয়ার জন্য।

নোট: সিলেট থোক প্রথমে জাফলং যাবেন । জাফলং বিজিবি ক্যাম্পের পাশ থেকে বৈঠা নৌকা অথবা ইঞ্জিন নৌকা নিতে পারেন। নৌকা রিজার্ভ নিলে ভাড়া চাইবে প্রায় ১৬০০ টাকা। এই টাকা এপার ওপার আসা যাওয়া, খাসিয়া পল্লী ও চা বাগান দেখে আসা – সবকিছুসহ। আর নরমালি পারাপার হতে চাইলে জন প্রতি ৩০ টাকা ভাড়া। তবে দামদর করে যাওয়া ভালো।

ঢাকা থেকে বাসে সিলেট

ঢাকার গাবতলী, ফকিরাপুল, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড থেকে বাস ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। বাসগুলো সাধারনত সকাল থেকে রাত ১২.৪৫ মিনিট পর্যন্ত তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর চলাচল করে।
সৌদিয়া এস আলম পরিবহন, গ্রীন লাইন পরিবহন, এনা পরিবহন, শ্যামলি পরিবহনের এসি বাসগুলোতে ভ্রমণ করতে পারেন। এই বাসগুলোর ভাড়া হয়ে থাকে ৮০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত। তবে নন এসি বাসে ক্ষেত্রে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, ইউনিক সার্ভিস, এনা পরিবহনেও সিলেট যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভাড়া হবে ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে। বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় ৬-৮ ঘন্টা।

ঢাকা থেকে ট্রেনে সিলেট

ঢাকা থেকে সিলেটের ট্রেনে গেলে সময় লাগে ৭-৮ ঘন্টা।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস, কালনী এক্সপ্রেস পুরো সপ্তাহ ঢাকা সিলেট রোটে চলাচল করে।

ট্রেনে সাধারণত ভাড়া হয়ে থাকে ৩২০ টাকা থেকে ১০৯৯ টাকা পর্যন্ত। ট্রেনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রাতে গমন করাই ভালো। সকাল হতে হতে পৌঁছে যাওয়া যায় সিলেট শহরে। তাই ঢাকা থেকে রাত ৯.৫০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস আপনার যাত্রা শুরু করে সারারাত ট্রেনে ঘুমিয়ে/বিশ্রাম করে সিলেট নেমেই সকাল সকাল আপনার সিলেটের সংগ্রাম পুঞ্জি ভ্রমণ শুরু করতে পারবেন।

আকাশপথে সিলেট

সংগ্রাম পুঞ্জি ভ্রমণ এর জন্য ঢাকা থেকে সবচেয়ে দ্রুত সিলেট যেতে পারবেন আকাশ পথে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের দেশের সকল বিমানবন্দর থেকে ইউএস বাংলা, ইউনাইটেড এয়ার, রিজেন্ট এয়ার, নভোএয়ার, বিমান বাংলাদেশে করে সিলেটে যেতে পারবেন স্বল্প সময়ে। এক্ষেত্রে প্রতি সিটের জন্য বিমানের ক্লাস অনুযায়ী টিকেটের মূল্য হতে পারে ৩৫০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত।

থাকার ব্যবস্থা

সেখানে জেলা পরিষদের বাংলো ছাড়া তেমন কোনো ভালো থাকার জায়গা নেই। তাই সংগ্রাম পুঞ্জি ভ্রমণ কারী পর্যটকেরা বেশিরভাগই রাত্রিযাপনের জন্য সিলেট সদরে ফিরে আসেন। আপনি যদি সেখানে থাকতে চান তাহলে মামার বাজার এলাকায় জাফলং ইন হোটেল, হোটেল প্যারিস ও আরো কিছু রেস্ট হাউজ পাবেন। এছাড়াও জৈন্তা হিল রিসোর্ট থেকে জাফলং এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

নোট: পুঞ্জিতে যাওয়া আসায় সময় না লাগার কারনে আপনাকে আর সেখানে থাকার চিন্তা করতে হবে না। সিলেট শহরে থাকার মত অনেকগুলো ছোট বড় হোটেল আছে, আপনি আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী যে কোন ধরনের হোটেল পাবেন। তার মধ্যে কয়েকটি পরিচিত হোটেল হল – হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা,কায়কোবাদ ইত্যাদি।

লালা বাজার এলাকায় কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে ৷ হোটেল অনুরাগ – এ সিঙ্গেল রুম ৪০০টাকা (দুই জন সাচ্ছন্দে থাকতে পারবেন), তিন বেডের রুম ৫০০ টাকা (৪ জন থাকতে পারবেন)।

রাত যাপনের জন্য দরগা গেইট রোডে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। রুম ভাড়া ৫০০/- টাকা থেকে ৫০০০/- টাকা পর্যন্ত।

  • শহরের শাহজালাল উপশহরে হোটেল রোজ ভিউ (০৮২১-৭২১৪৩৯)।
  • দরগা গেইটে হোটেল স্টার প্যাসিফিক (০৮২১-৭২৭৯৪৫)।
  • ভি আই পি রোডে, হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৬০৭৭)।
  • বন্দরবাজারে, হোটেল মেট্রো ইন্টারন্যাশনাল (০৮২১-৭২১১৪৩)।
  • নাইওরপুলে, হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০)।
  • জেল সড়কে, হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫)।
  • লিঙ্ক রোডে, হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭)।
  • আম্বরখানায়, হোটেল পলাশ (০৮২১-৭১৮৩০৯)।
  • দরগা এলাকায়, হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)।
  • হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)।
  • জিন্দাবাজারে, হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)।
  • তালতলায়, গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮) ইত্যাদি।

খাবারের ব্যবস্থা

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা ভ্রমণ এ খাবারের জন্য পাবেন জাফলং পর্যটক রেস্টুরেন্ট, সীমান্ত ভিউ রেস্টুরেন্ট, জাফলং ভিউ রেস্টুরেন্ট এছাড়াও বিভিন্ন মানের সাধারণ হোটেল। তবে জাফলং রেস্টুরেন্টের পরিমাণ কম হওয়ায় খাবারের মূল্য কিছুটা বেশি। তাই সিলেট শহরে খাবার খেতে চাইলে জিন্দাবাজার এলাকার পানসী, পাঁচ ভাই, পালকি রেস্টুরেন্ট ভালো মানের খাবার পাওয়া যায় সেখানে খাবার খেতে পারবেন।

সংগ্রাম পুঞ্জির আশপাশের কিছু দর্শনীয় স্থান

সংগ্রামপুঞ্জি জলপ্রপাত দেখতে গেলে এমনিতেই জাফলং দেখে আসতে পারবেন। জলপ্রপাত এর কাছাকাছি রয়েছে আরো বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। সেগুলোর মধ্যে খাসিয়াদের পুঞ্জি, তামাবিল জিরো পয়েন্ট এবং লালাখাল জলাবন অন্যতম। এছাড়া ঘুরে আসতে পারেন।

জাফলং

জৈন্তা হিল রিসোর্ট 

রাতারগুল জলাবন সিলেট

ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর

ভ্রমণ টিপস ও সতর্কতা

  • সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা ভ্রমনের উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল।
  • বর্ষাকালে ঝর্ণাটি থাকে পূর্ণ যৌবণা।
  • এডভেঞ্চারের নেশায় ঝর্ণায় উঠতে গিয়ে অসতর্ক হয়ে নিচে পড়লে যেকোনো বড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।
  • সেখানে পিয়াইন নদীতেও অনেক স্রোত থাকে।
  • নদী পারাপার হওয়ার সময় সাবধান থাকতে হবে।
  • দলগত ভাবে ভ্রমণ করলে সবসময় খরচ কম পড়বে।

আরও পড়ুন: 

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ও ইকোপার্ক – যাবার উপায় ও ভ্রমণ টিপস

মালনীছড়া চা বাগান

হযরত শাহ পরান (রঃ) এর মাজার

হযরত শাহ জালাল (র:) মাজার, সিলেট

শেষকথা

ঝর্ণা প্রেমি মানুষ প্রতিদিন ভিড় করেন এই সংগ্রাম পুঞ্জিতে। প্রকৃতি কত সুন্দর তা এই পুঞ্জিতে না গেলে বুজতেই পারবেন না। সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা দেখার আগ্রহ থাকলে অবশ্যই যাওয়া উচিত।