শিমলা ভ্রমণ এর সকল তথ্য ও ভ্রমণটিপস

শিমলা ভ্রমণ এর সকল তথ্য ও ভ্রমণটিপস: শিমলা (Shimla) একটি চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র, যা উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী । ১৯৭১ সালে শিমলা হিমাচলের রাজধানী হিসেবে ঘূষিত হয়, এর আগে ১৮৭১ সাল থেকে শিমলা পাঞ্জাবের রাজধানী ছিল। ইংরেজ শাসনামলে শিমলা ভ্রমণের এই আকর্ষণীয় স্থানকে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শিমলাতে মাত্র ২ লক্ষ লোকের বাসস্থান যা ভারতের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার প্রাদেশিক রাজধানী। শহরটি প্রাকৃতিক নয়া-স্বর্গের পরিপূর্ণ “হিল স্টেশনের রানী” হিসেবে পরিচিত। শিমলাতে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে আর পর্যটকদের কাছে শিমলা শীতের ওয়ান্ডারল্যান্ড হিসেবে খ্যাত পেয়েছে।

শিমলা ভ্রমণের দর্শনীয় স্থান

সেন্ট মাইকেল ক্যাথিড্রাল (ST. Michael’s cathedral)

শিমলার প্রথম ক্যাথলিক গির্জা যা ১৮৮৫ সালে প্রথম নির্মাণ করা হয়েছে। গির্জায় পাথরের কারুকাজ গুলো অনেক সুন্দর। গির্জায় নির্মিত পাঁচটি বেদি যা ইতালি থেকে আনা হয়েছিল। গির্জাটিকে দেখার জন্য অসংখ্য পর্যটক এখানে এসে থাকেন।

ভ্যাইসরিগেল লজ (Viceregal Lodge)

শিমলা ভ্রমণ এর আকর্ষণীয় ১৩০ বছর পুরনো এই লজটি ব্রিটিশ ভাইসরয়ের বাসভবন ছিল। বর্তমানে এই লজ টি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ এডভান্স স্টাডিজের সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত। ১৮৮৮ সালে এই লজটিকে ব্রিটিশ হেনরি ইরউইনের ডিজাইনে নির্মাণ করা হয়েছিল। এখান থেকে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের এক চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।

কোটগড় (Kotgarh)

আপেলের জন্য বিখ্যাত এই কোটগড়। এটি শিমলা থেকে ৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখানে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেমন, দেরথু মাতা টেম্পল, হেতু পিক ও মন্দির ও তানজুব্বার লেকসহ দেখারমতো আরো অনেক স্থান রয়েছে।

মল রোড (Mall road)

শিমলা ভ্রমণে গেলে মল রোডে বিপুল সংখ্যক লেন্ডমার্ক হওয়ায় পর্যটকদের কাছে স্থানটি খুবই জনপ্রিয়। মল রোডকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। মল রোডকে শিমলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ও বিবেচিত করা হয়। মল রোডে অনেক ক্লাব, রেস্টুরেন্ট, বার ও বিভিন্ন রকমের অসংখ্য দোকান রয়েছে এবং বিভিন্ন রকম বিনোদনেরও ব্যবস্থা রয়েছে । মল রোডের রাস্তা ধরে হাঁটলে এখানকার নাগরিক জীবন দেখা যাবে। মল রোডের স্নোফল দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে এক কথায় অসাধারণ।

দ্যা রিজ (The ridge)

রিজ একটি উন্মুক্ত স্থান যা একটি গোটা এড়িয়ে নিয়ে গঠিত। দ্যা রিজে অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক রয়েছে যেখানে অনেক ধরনের আয়োজন হয়ে থাকে। এখান থেকে পার্শ্ববর্তী যে পর্বতগুলো রয়েছে সেগুলোর এক অপরূপ সৌন্দর্য পরিদর্শনও করা যায়। শিমলার জনজীবনের জন্য শহরের এই অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই স্থানের নিচে জলাশয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি শহরের একটি প্রধান অংশে জল সরবরাহের দায়ভারে রয়েছে। দ্যা রিজ শিমলার সবচেয়ে বেশি কার্যকলাপ কেন্দ্র রূপে পরিচিত।

সামার হিল (Summer hill)

সামার হিল মল রোডের কাছে কলকা শিমলা রেললাইনে অবস্থিত। পথের চারপাশে বিভিন্ন রকমের গাছপালা যেমন ওক, সেডার, রডেনড্রনসহ আরো অনেক গাছপালা গড়ে উঠেছে। এই এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত ভবন হল ম্যানরভিলেই ম্যানশন হল এখানে মহাত্মা গান্ধী শিমলা ভ্রমণের সময় ছিলেন। পর্যটকদের কাছে সামার হিল খুবই জনপ্রিয় একটি স্থান।

জাখু মন্দির (Jakhoo Mondir)

জাখু মন্দির একটি প্রাচীন মন্দির। এই মন্দিরটি শিমলার সর্বোচ্চ পিক জাখু হিলে অবস্থিত। হিন্দুরা মনে করেন তাদের হনুমান দেবতাকে উৎসর্গ করা এটি একটি প্রাচীন মন্দির। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৪৫৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখানে প্রতি বছর ‘দশেরা’ উৎসব দেখার জন্য অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমায়।

কুফরি (Kufri)

কুফরি শহরটি শিমলা শহর থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ২২ এর দিকে ১৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এটি হিমাচল প্রদেশের শিমলা জেলার ছোট্ট একটি হিল স্টেশন। কুফরিতে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেমন- কুফরি ফান ওয়াল্ড, নাগ টেম্পল, হিমালায়ান ন্যাচার পার্ক, মহাশু পিক, শিমলা ওয়াটার ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুড়ী। এছাড়াও রয়েছে কুফরিতে ইয়াক রাইট, মহাশু পিক থেকে স্কাইং ও ট্র্যাকিং করা।

এগুলো ছাড়াও আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে।হাতে সময় থাকলে ফাগু, তত্তপানি, গেইতি, হিমাচল স্টেট মিউজিয়াম, জনিস ওয়াক্স মিউজিয়াম, নালদেহরার মত জায়গা গুলোতে ঘুরে আসতে পারেন।

আরও পড়ুন: হিমালয় পর্বতমালা 

শিমলা ভ্রমণে কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে প্রথমে কলকাতা যেতে হবে।
শিমলা

ঢাকা থেকে প্রথমে কলকাতা যেতে হবে। কলকাতা বিভিন্ন মাধ্যমে যাওয়া যাবে যেমন বাস, ট্রেন অথবা বিমানে করে। আপনি ৭০০-৬,০০০ টাকার মধ্যে কলকাতা যেতে পারবেন। কলকাতা থেকে কলকা যেতে হবে। কলকাতা থেকে কলকা যাওয়ার ট্রেনটি হল কলকা মেইল (ট্রেন নাম্বার ১২৩১১), হাওরা থেকে রাত ০৭:৪০ মিনিটে ছেড়ে গিয়ে তৃতীয় দিন সকাল ০৪:৩০ মিনিট নাগাদ কলকা পৌঁছে। স্লিপার ক্লাস ৬৮০ রুপী, এসি থ্রি-টায়ার ১৮৫০ রুপী, এসি টু-টায়ার ২৭০০ রুপী এবং এসি ফার্স্টক্লাস ৪৮০০ রুপী (প্রায়)।

কলকা পৌঁছে সেখান থেকে টয় ট্রেনে করে শিমলা যেতে পারবেন। আপনি চাইলে ট্যাক্সি অথবা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে শিমলা আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে গাড়ির ধরন বুঝে ভাড়া কম ও বেশি পরতে পারে।

শিমলা ভ্রমণে কোথায় থাকবেন

শিমলা ভ্রমণে থাকার জন্য মল রোড, জাখু টেম্পল এর কাছেই বিভিন্ন মানের অনেক হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলো হলো থিরাম শিমলা, হোটেল ভাটিকা, রাজ হোম স্টে, নিউ সান্সার মল রোড, আমার ভিলা হোটেল , আডোব রোমস হোটেল, মেহদুদিয়া গেস্ট হাউস, সি শিমলা হোটেল ও গেস্ট হাউসে এক রাতে দুজনে থাকার জন্য ৫৫০-১০০০ টাকা খরচ পড়বে।

শিমলাতে কোথায় ও কি খাবেন

খাবারের জন্য ভালো মানের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেমন – The Devicos, Cecil, Baljee’s & Fascination, Qila উল্লেখ্য। শিমলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে রয়েছে মুর্গ আনার দানা (ডালিমের সাথে মুরগির স্টো), ছা ঘোস্ট (দই দিয়ে ভেড়ার মাংস) ও ডাল ছানা বিশেষভাবে জনপ্রিয়। আরো রয়েছে সিদু (এক ধরনের বিশেষ রুটি) থোকপা (নুডুলস স্যুপ), মাদ্রা (বিভিন্ন মসলার মিশ্রণের ডাল), বাবরু (ডালের বড়ার সাথে তেঁতুলের চাটনি), ধাম (এক ধরনের বিশেষ প্লেটার) এই খাবারগুলো খেয়ে দেখতে পারেন। দ্যা রিজে কিছু ঐতিহ্যবাহী স্ট্রিট ফুড গুলো ও খেয়ে দেখতে পারেন।

শিমলা ভ্রমণ টিপস

<yoastmark class=

  • দালাল হতে সতর্ক থাকুন।
  • ট্রেন যাতায়াতের ক্ষেত্রে পানির বোতল ও শুকনো খাবার সাথে রাখুন।
  • পাহাড়ে অবস্থিত টুরিস্ট স্পটগুলোতে চলাফেরার ক্ষেত্রে সাবধান থাকবেন।
  • আগে থেকে টয় ট্রেনের বুকিং না দিয়ে কলকা গিয়ে ট্রেনের টিকেট কাটবেন এতে খরচ কম পড়বে।
  • শিমলা ভ্রমণ এ গেলে সাথে মানালিও ভ্রমণ করতে পারেন। একসাথে ঘুরে দেখলে এতে খরচ কম হবে।
  • মন্দিরগুলোতে অসংখ্য পরিমাণে বাঁদর রয়েছে যেগুলো সুযোগ পেলেই পর্যটকদের কাছ থেকে এটা ওটা নিয়ে নেয়
  • আপনার ছোট ছোট জিনিসগুলা সাবধানে রাখবেন।
  • যে সকল জায়গায় যাবেন সেসব স্থানের অফলাইন ম্যাপ মোবাইলে ডাউনলোড করে রাখুন।
  • শিমলাতে থাকা খাওয়া ও ঘুরাঘুরি সহ তিন রাত ও দুই দিনে জনপ্রতি খরচ পড়বে ১২,০০০ – ১৫,০০০ টাকা।

শিমলা সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্নোত্তর (FAQ’s)

পর্যটকদের কাছে শিমলা কি নামে পরিচিত?

পর্যটকদের কাছে শিমলা শীতের ওয়ান্ডারল্যান্ড হিসেবে পরিচিত।

কত সালে শিমলা হিমাচলের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়?

১৯৭১ সালে শিমলা হিমাচলের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়।

শেষকথা

শিমলাতে খুব কম লোকের বাসস্থান যা ভারতের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার প্রাদেশিক রাজধানী। শিমলা ভ্রমণে দেখার মতো অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে আর পর্যটকদের কাছে শিমলা শীতের ওয়ান্ডারল্যান্ড হিসেবে খ্যাত পেয়েছে।